• 66

‘ভাষার প্রতি টান-ভালবাসা কখনো কমেনা’

‘ভাষার প্রতি টান-ভালবাসা কখনো কমেনা’

নিউইয়র্কের জনপ্রিয় কমিউনিটি নিউজ নেটওয়ার্ক এফএম ৭৮৬’র নিয়মিত আয়োজন ‘নিউইয়র্ক ডায়েরি’-তে অতিথি হয়ে এসেছিলেন বিশিষ্ট কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সাহিত্য ও কবিতার সাথে নিজের জীবনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।


আরজে মোহনা: কেমন আছেন?

কাজী জহিরুল ইসলাম: আমি সব সময় ভালো থাকার দলে। আমি ঐ শ্রেণির মানুষ না যারা অতীতের ভালো খারাপ নিয়ে ভেবে এবং ভবিষ্যতের জন্য অধিক ভেবে বর্তমান সময়টাকে নষ্ট করে। কারোরই উচিত নয় অতীত নিয়ে আক্ষেপ করা।


আরজে মোহনা: কার অনুপ্রেরণায় বা উৎসাহে লেখালেখির শুরু?

কাজী জহিরুল ইসলাম: ছোটবেলা থেকেই বাংলা বইয়ের প্রতি, বাংলা লেখার প্রতি আলাদা ঝোঁক ছিলো। বই পাওয়ার পর থেকেই প্রথম রাতেই বইটা পুরোটা পড়ে ফেলতাম। নিজের ক্লাসের থেকে ৩/৪ক্লাস উপরের বাংলা বইগুলোও আমার পড়া থাকতো। যখন ক্লাস ফোরে পড়ি তখনই প্রথম কবিতা লিখেছিলাম। গ্রামে যেয়ে ক্ষেতে তামাক চাষরত অবস্থায় থাকা চাষী এবং দূরে শ্মশানে বাঁশি বাজানো রাখালকে নিয়েই লিখেছিলাম।


প্রথম বই প্রকাশের গল্প এবং অনুভূতি শুনতে চাই?

প্রথম বই প্রকাশের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিলো ১৯৯২ সালে। আমার এক বন্ধুর বাবা কবি ছিলেন, আমি তার ভক্ত ছিলাম। তাই বিশ্বাস করে সেই বন্ধুকে কয়েক ধাপে অনেক কষ্ট করে টাকা দিয়েছিলাম। কিন্তু ফেব্রুয়ারির বই মেলার পরে বুঝতে পারলাম সে আমার টাকাটা নিজে নষ্ট করে ফেলেছে। সে ফেনসিডিল আসক্ত ছিলো। এই ব্যাপারটা খুব বেশি বিব্রতকর ছিলো। অবশেষে ১৯৯৪ তে আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয়।


কবিতা ছাড়া আর কি লিখতে ভালবাসেন?

সত্যি বলতে, আমি সবই লিখতে চাই। এখন পর্যন্ত সব বিষয়ে মোট ৭০টির মতো বই প্রকাশিত। আমার গল্পে বিটিভি, আরটিভিতে নাটক প্রচারিত হয়েছে। আমার লেখা গানে শ্রদ্ধেয় সুবীর নন্দী গান করেছেন। সব ক্ষেত্রেই চেষ্টার ধারা অব্যাহত রাখতে চাই। এখন অবধি গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য এবং মঞ্চ নাটক লিখিনি। যদি কোনো মঞ্চ নাটকের দল বিশেষভাবে বলে তখন লিখবো। 


আপনার নিজস্ব পছন্দের কবি কে?

বিশ্ব সাহিত্যের মধ্যে পার্শি বিশি শেলী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসিমউদ্দীন, ওনারা তো বাংলা কবিতার বটবৃক্ষের মতো। এদের পরে বাংলা কবিতায় যারা আমূল পরিবর্তন এনেছেন তাদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ আমার অনেক পছন্দের। এরপর যদি বলি তাহলে কবি আল-মাহমুদ। যার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হয়তো কাজী নজরুল ইসলামের মতো ম্যাট্রিক পর্যন্তই ছিলো। কিন্তু কবিতা, লেখা নিয়ে তার ধারণা, জ্ঞান অনবদ্য ছিলো। আমার সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কও বেশ ভালো ছিলো। আমি নিজে আফ্রিকা, প্যারিস, লন্ডন ঘুরে এসেও যা জানতাম না তিনি সেসবও বই পড়েই জানতেন।


জাতিসংঘের কর্মকর্তা, খণ্ডকালীন সাংবাদিকতার পরও লেখার জন্য সময় কিভাবে বের করেন?

আমরা সময় পাই না এটা চূড়ান্ত মিথ্যা কথা। আমরা সময়টা ঠিকঠাক ভাবে কাজে লাগানোর উপায় খুঁজে পাই না। আমি যেমন যখন যা লেখা মাথায় আসে তখনই হুট করেই ফোনটা হাতে নিয়েই লিখে ফেলি। আমাদের জন্য লেখা এখন অনেক সহজ। আগেকার মতো খাতা কলম নিয়ে বা কম্পিউটারের সামনে বসে কষ্ট করে লিখতে হচ্ছে না। তারপরও যদি কেউ বলে যে সময় পাই না এটা আলসেমির জন্যই বলে। ইচ্ছা থাকলেই সম্ভব। 


নতুন যারা লেখালেখিতে আসছেন তাদের জন্য কি বলতে চান?

লিখতে হলে পড়তে হবে। পড়ার কোনো বিকল্প নেই। বেশি বেশি পড়লে তবেই বেশি বেশি শব্দ,বাক্য,ছন্দ শেখা যাবে। অনেকেই বলবে ছন্দ মানেন না। না মানলেও জানতে হবে। যারা গদ্য লেখেন তাদের জানতে হবে প্রতিটা লাইনের পরের লাইন পড়ার জন্য পাঠককে কিভাবে আকৃষ্ট করা যায়। যারা পদ্য লিখবেন তাদের কথামালা সাজিয়ে সুন্দর ভাবে গভীরতার সাথে লেখাটা ফুটিয়ে তুলতে জানতে হবে। 


প্রবাসীদের বাংলা চর্চায় কিভাবে উদ্বুদ্ধ করা যাবে?

কাজী জহিরুল ইসলাম: আমি বিশ্বাস করি, ভুলতে বসলেও ভাষার প্রতি ভালোবাসা বা টান কোনোটাই কমে না। বরং বেড়ে যায়। দেশে থাকলে যেমন সবাইকে নিয়ে সহজে জীবনের দৈনন্দিন কাজগুলো করা যায়। কিন্তু এখানে একটা মানুষের প্রত্যেকটা কাজ নিজেকে করতে হয়। আর আর্থিক দিকটা তো রয়েছেই, যেটার উদ্দেশ্যে মানুষ প্রবাসে পাড়ি জমায়। সব মিলিয়ে তখন এখানে যেই ভাষাটা প্রয়োজন সেটার ব্যবহারই আমরা বেশি করি। ইচ্ছে করেই হোক বা বাধ্য হয়েই হোক। তারপরও নিজের ভাষার প্রতি ভালোবাসা ধরে রাখার জন্য প্রতিরাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে অন্তত ১০মিনিট বা আধঘন্টা কোনো বাংলা বই পড়ুন। দেখবেন যে বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা টাও কমছে না, ভুলতেও বসছেন না।

আপনার মতামত লিখুন :