• 128

গণতন্ত্র বিরোধিতার শাস্তি হওয়া প্রয়োজন

গণতন্ত্র বিরোধিতার শাস্তি হওয়া প্রয়োজন

রাজনীতিবিদরা সমাজের সামনের সারির মানুষ। তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি-প্রজ্ঞা সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি বলে ধরে নেয়া হয়। অর্থাৎ, তারা সমাজের বিচক্ষণ এবং আলোকিত অংশের প্রতিনিধিত্ব করেন বলে ভাবতে ভাল লাগে। রাজনীতি যদি হয় উন্মুক্ত সমাজ পরিচালনার পন্থা, আর সমাজ পরিচালনার সে দায়িত্বটি পালন করেন রাজনীতিবিদেরা। যে কারণে তাদের কাছ থেকে জনগণ সর্বোচ্চ সততা, স্বচ্ছতা এবং নৈতিকতা আশা করে। গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায় সংবিধান এবং জনস্বার্থ। জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রাষ্ট্র পরিচালনার দলিল সংবিধানের আওতায় তাদের দায়িত্ব পালন করেন।


এখানে একটা কথা সামনে আনা প্রয়োজন। রাজনীতি এখন পরোপুরি নি:স্বার্থ জনসেবা নয়। এ কাজটি এখন পেইড প্রফেশনের মতো। গণতান্দ্রিক সমাজে প্রতিটি দেশ একেকটি সামাজিক ক্লাবের মতো। ক্লাবের সদস্যরা যেমন ক্লাবের মালিক, তেমনি রাষ্ট্রের মালিক সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের জনগণ। ক্লাব চলে সদস্যদের চাঁদায়, তেমনি রাষ্ট্রও চলে নাগরিকদের কর বা ট্যাক্সের পয়সায়।

সুনির্দিষ্ট বিধি-বিধানের আওতায় ক্লাবের পরিচালক মন্ডলির মতোই প্রেসিডেন্ট ,সিনেটর, কংগ্রেসম্যান, মেয়র, কাউন্সিলর , গভর্ণর সহ জনপ্রতিনিধিরা নির্দিষ্ট মেয়াদে দেশ পরিচালনা করেন। ক্ষমতা অনুশীলনের পাশাপাশি তাদেরকে বেতন-ভাতা দেয়া হয়। দায়িত্ব পালন নির্বিঘ্ন করার জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক তাদেরকে গাড়ি-বাড়িসহ অন্যান্য সকল সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়। জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করাই বেতনের শর্ত।


যদিও সেবা করার জন্য ক্ষমতায় এসে জনগণের কল্যাণ এবং অকল্যাণ দু’ধরণের সুযোগই জনপ্রতিনিধিদের থাকে। কারণ, রাজনীতি যেহেতু নিয়ন্ত্রিত হয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বারা; সেই নেতৃত্ব কলুষিত হয়ে গেলে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের পরিবর্তে দুর্দশাও নেমে আসতে পারে। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ , ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানী মিলিটারি এবং তাদের অনুগত রাজাকার-আলবদরের ভূমিকা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ইদানিং আমেরিকান রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সৌজন্যে দ্বিতীয়টির প্রাধান্যই পরিলক্ষিত হচ্ছে। এবং এটাই আজকের লিখার প্রতিপাদ্য বিষয়।


আমেরিকাকে সারা বিশ্বের গণতন্ত্রের মডেল ধরা হয। জনপ্রতিনিধিরা জনগণের কাছে তাদের কর্মের জবাবদিহিতা করেন। জনপ্রতিনিধিদের মানুষ সম্মান করে,কিন্তু হুজুর হুজুর করে না; বরং জনগণকে তাঁদের হুজুর হুজুর করতে হয়। কারণ সহজ। জনগণ দেশের মালিক। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। নির্দিষ্ট সময়ে ভোট হয়। নির্দিষ্ট সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়। এ নিয়ে কোন বিশৃঙ্খলা আজ পর্যন্ত হয়নি। কিন্তু ট্রাম্প সাহেব ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একটা ঘোমট অবস্থা তৈরী করছেন। আমেরিকার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়,এমন সব কর্মকান্ড করে বিশ্ববাসীর কাছে আমেরিকাকে হেয় প্রতিপন্ন করছেন। একের পর এক ভুল বার্তা দিয়ে আমেরিকাকে প্রায় বন্ধুহীন করে ফেলেছেন।


রাষ্ট্রপতি একটা দেশের অভিভাবক। তার কাজ হলো অনুরাগ বা বিরাগের উর্ধ্বে ওঠে শ্রেণী-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সকল জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিভাবক সুলভ আচরণের পরিবর্তে বিভেদ তৈরী করছেন। স্বয়ং রিপাবলিকান দলীয় সিনেটর প্যাট টমি বলেছেন,’ট্রাম্পকে ইতিহাস মনে রাখবে দুর্দশা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে’। লাগামহীন ফালতু কথাবার্তা বলে প্রেসিডেন্টের নামক পদটির ওজনও তিনি হালকা করেছেন। অসৎ পন্থায় নিজ এবং পরিবারের সদস্যদের অন্যায় সুবিধা দিচ্ছেন। দেশের স্বার্থের চেয়ে নিজ স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার অভিযোগে কংগ্রেসে তারা বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবও আনা হয়েছিল।


একশ বছর আগে বাঙালী সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘আইন সেতো তামাশা, মানুষ পয়সা খরচ করিলেই সে তামাশা দেখিতে পারে’।


২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার অনুগত সমর্থকদের আচরণ যেন সে তামাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। লং স্টোরি শর্ট করে বললে, নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন, কিন্তু উনি ক্ষমতা ছাড়বেন না। উনাকে ষড়যন্ত্র করে পরাজিত করা হয়েছে এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ শুনতে শুনতে মানুষের কান ঝালাপালা।


উপাদানহীন মামলা গ্রহণে আদালত বিরক্ত। স্টেট কোর্ট, ফেডারেল কোর্ট ক্লান্ত। এমনকি তার নিজ হাতে নিয়োগ দেয়া বিচারপতিরাও তার অভিযোগ শুনতে নারাজ। কয়েকটি স্টেটে ভোট পুনঃগণনা করা হয়েছে, কিন্তু ফলাফলের কোন হেরফের হয়নি। কারণ মিথ্যা দিয়ে দিনকে রাত করা সম্ভব নয়। ডজনখানেক কোর্টে হেরেছেন। কিন্তু থামছেন না।


এবার চীন, রাশিয়া স্টাইলের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেমেছেন; সে উদ্দেশ্যে ফেডারেল কোর্টে মামলা করেছিলেন তার বাধ্যগত আইন প্রণেতা লুই গহমার্ট। এবারের দাবী অনেকটা পাকিস্তান আমলের মৌলিক গণতন্ত্র স্টাইলের। আগামী ৬ জানুয়ারি ভাইস প্রেসিডেন্টের সভাপতিত্বে কংগ্রেসের যে যৌথ অধিবেশন বসবে, সেখানে ইলেক্টরাল কলেজের পরিবর্তে কংগ্রেস এবং সিনেটররা ভোট দেবে। শুধু তাই নয়, কারা কারা ভোট দিতে পারবে সেটাও নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। ফেডারেল বিচারপতি সে মামলাও খারিজ করে দিয়েছেন।


উনাদের ‘এ’ প্ল্যান, ‘বি’ প্ল্যানের মতো নিশ্চিয়ই অনেক প্ল্যান আছে। সেই প্ল্যানের আলোকে এবার বর্ণবাদী সিনেটর টেড ক্রুজ সহ ১১ রিপাবলিকান সিনেটর নতুন দাবী তুলেছেন। নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে কিনা তা তদন্ত করার জন্য ৬ জানুয়ারীর কংগ্রেস অধিবেশন স্থগিত করে ১০ দিনের জরুরী অডিট চান। সে পর্যন্ত ফলাফল অনুমোদন স্থগিত থাকবে। উনাদের মানসিক শক্তি এবং দুষ্ট বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়। আসল উদ্দেশ্য একটাই, নির্বাচনের ফল পাল্টে দেয়া।


গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল কথা ‘পিপল ফার্স্ট’। কিন্তু রিপাবলিকান অন্ধ সমর্থকদের কাছে ট্রাম্প ফার্স্ট। ৬ জানুয়ারির অধিবেশনকে সামনে রেখে প্রাউড বয়েজ, কেকেআর সহ অন্যান্য উগ্র শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী সংগঠনগুলি ওয়াশিংটনে আসতে শুরু করেছে। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, এ সমাবেশ শান্তিপূর্ণ নাও হতে পারে। একথা বলার মাধ্যমে তিনি মূলত সন্ত্রাসীদেরকে উৎসাহিতই করছেন। ইতোমধ্যে শক্তিশালী অস্ত্রসহ প্রাউড বয়েজ নেতা এনরিক টেরিওকে গ্রেফতার করেছে ওয়াশিংটন পুলিশ। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য তলব করা হয়েছে ন্যাশনাল গার্ড। একদিকে প্রাউড বয়েজের সন্ত্রাস , অন্যদিকে নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেয়ার জন্য প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার অপ-ব্যবহারের ফলে দেশ ব্লেক লাইফ মেটার আন্দোলনের মতো পুনরায় অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন।এবং ভবিষ্যতে এটা গোটা আমেরিকার ঐক্যেও ফাটল ধরাতে পারে।


তাছাড়া, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রলোভন এবং ভয়-ভীতি দেখানোর মাধ্যমে শুধু জনরায়ের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেননি, গণতন্ত্রকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। নিজ পার্টি রিপাবলিকান সদস্য জর্জিয়ার সেক্রেটারী অব স্টেট ব্র্যাড রাফেনস্পার্গকে নির্বাচনের ফলাফল পাল্টানোর চাপ এবং ভীতি প্রদর্শন করে আইন লংঘন করেছেন। কারণ, আমেরিকার আইন অনুসারে নির্বাচন ফলাফল পাল্টে দেয়ার প্রচেষ্টা এবং ষড়যন্ত্র একটি দন্ডনীয় অপরাধ। নিউ ইয়র্কের সাবেক এটর্নি জেনারেল পিট ভাবার মতে, নির্বাচনী ফলাফল পাল্টে দেয়ার প্রচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র দন্ডনীয় অপরাধ।


খোদ রিপাবলিকান গলের সিনেটর সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সিনেটর মিট রমনী, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র নিউ জার্সির সাবেক গভর্ণর ক্রিস ক্রিস্টি, প্যানসিলভেনিয়ার রিপাবলিকান সিনেটর প্যাট টমি ট্রাম্পের এমন প্রচেষ্টাকে গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেছেন।


সবচেয়ে বড় কথা, মনগড়া অভিযোগের ভিত্তিতে জনরায়কে পাল্টে দেয়ার প্রচেষ্টা গণতন্ত্রের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। সমাজের স্থিতিশীলতার জন্য এ বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।


লেখক: কলামিস্ট ও এক্টিভিস্ট

আপনার মতামত লিখুন :