• 79

বাঙলাভাষার বিবর্তন, বিকাশ ও প্রগতি প্রসঙ্গ | শিকদার মুহাম্মদ কিব্রিয়াহ

বাঙলাভাষার বিবর্তন, বিকাশ ও প্রগতি প্রসঙ্গ | শিকদার মুহাম্মদ কিব্রিয়াহ

বাঙলাভাষার বিবর্তন, বিকাশ ও প্রগতি প্রসঙ্গ

বিশ্বের ইতিহাসে আমরাই সে-ই অনন্য জাতি, যারা মাতৃভাষার জন্য আত্মোৎসর্গ করেছি। এমন ঘটনা বিশ্ব-সভ্যতা কখনও প্রত্যক্ষ করে নি। ১৯৪৮ ঈসাব্দে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ-এর সদম্ভ ঘোষণা "উর্দু, কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা"-এর প্রতিবাদ এবং বাঙলাকে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা  করার দাবিতে যে ঐতিহাসিক আন্দোলনের সূচনা, বায়ান্ন'র আত্মোৎসর্গের মধ্য দিয়ে তার সফল পরিসমাপ্তি। এর মাধ্যমে বিশ্বের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন-এর বর্ণাঢ্য অধ্যায়-সংযোজন। সালাম, রফিক,শফিক, বরকত, জব্বার ইতিহাসের নায়ক। আত্মদানের অভিনব অধ্যায়। ইতিহাসে এমন গৌরবময় অধ্যায়ের স্রষ্টা যে ভাষা-সে ভাষার বিকাশ, সমৃদ্ধি ও প্রভাব কী সে-ই মানে অর্জিত হয়েছে? জবাবটি নিশ্চিতভাবেই নেতিবাচক। 


বাঙলা ভাষার ভৌগোলিক এলাকা বলা চলে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, কাছাড়, শিলচর, করিমগঞ্জ, বদরপুর, হাইলাকান্দি ও আসামের আরও কিছু এলাকায়। স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে একমাত্র বাংলাদেশই হচ্ছে বাঙলাভাষী মানুষের দেশ। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি প্রাদেশিক রাজ্য। স্বাধীন ও সার্বভৌম দৈশিক সত্তা ও বাঙলাভাষী মানুষের সংখ্যাধিক্যের বিচারে বলা যায়, বাঙলাভাষার বিকাশ ও সমৃদ্ধিতে বাংলাদেশেরই নেতৃত্ব দেবার কথা। কিন্তু কার্যত তা হয় নি। বাঙলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি লাভ করলেও পূর্ব পাকিস্তানের সর্বস্তরে বাঙলা প্রচলনের কোন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় নি। পাকিস্তানি শাসকদের অনাগ্রহ, বাঙলাকে হিন্দুয়ানী ভাষারূপে বিবেচনা, রবীন্দ্র সংগীত বর্জন ইত্যাদি সাম্প্রদায়িক হীনমন্যতা এবং সর্বোপরি সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম তথা রাজনৈতিক টানাপড়েনে ভাষার দিকে মনোযোগী হবার প্রেক্ষাপট ছিল না আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দের-এমনটিই অনুমিত হয়। আবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিক-শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই সচেতন বা অবচেতনভাবে কলকাতাকেই বাঙলাভাষা ও সাহিত্যের রাজধানী  হিসেবে জ্ঞান করতেন। কলকাতার স্বীকৃতিই যেন আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের মানদণ্ড। অথচ তারা এটি অনুধাবন করতে সক্ষম হন নি যে, পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশের বাঙলার মধ্যে যেমনি আছে গঠনতান্ত্রিক পার্থক্য, তেমনি আছে সাংস্কৃতিক পার্থক্য।


ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এটি সহজেই অনুমিত যে, পশ্চিমবঙ্গের বাঙলা সংস্কৃত ভাবধারায় গঠিত, পুনর্গঠিত বা বিধৌত—তৎসম শব্দজাত বা প্রভাবিত। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশী বাঙলা ভাষা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনভাবেই সংস্কৃতের দুহিতা নয়। এ অঞ্চলের বাঙলার উৎপত্তি, বিকাশ বা প্রবহমানতা আদৌ সংস্কৃতমুখী বা তৎসম ভাবধারার নয়। বরং প্রাকৃত ভাষা থেকে উদ্ভূত এ ভাষা ভাটিবাংলার আবহমান উদার সাংস্কৃতিক ভাবধারার ঐতিহ্য-সমৃদ্ধ বিশেষ প্রকৃতির। এ ভাষা কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্য-নির্ভর তথাকথিত আদর্শ বাঙলার তুলনায় অধিক জীবনধর্মী ও লালিত্যপূর্ণ। কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙলা সর্বভারতীয় জাতীয়তায় বিলীন হওয়ার কারণে এর জাতীয়তাভিত্তিক বিকাশ ও সমৃদ্ধি প্রশ্নাতীত নয়। কেননা অন্তর্গতভাবে স্বাধীন চেতনার ঘাটতি থাকবেই। এ স্বাভাবিক সত্যের উপলব্ধিতেও কথিত বুদ্ধিজীবীরা ব্যর্থ হন। এদিকে, ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে জাতীয়তার রাষ্ট্রিক বিকাশ ও স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, সে জাতির ভাষার বিকাশ ও সমৃদ্ধির চেতনা সর্বাত্মক হওয়াই স্বাভাবিক। এ সত্যটির উপলব্ধি না করে কলকাতার কাছে বুদ্ধিবৃত্তিকে বন্ধক রাখার আত্মঘাতী প্রবণতাই আমাদের ভাষার কাঙ্খিত বিকাশ ও সমৃদ্ধিকে ভীষণভাবে ব্যাহত করেছে। স্বাধীন ও স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হওয়ার কারণেই ভাষাতাত্ত্বিক বিকাশ ও সমৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত গবেষণা ও আবিষ্কার কাঙ্খিত মাত্রায় হতে পারে নি বলেই অনুমিত হয়।

বাঙলা ভাষার বিবর্তন, বিকাশ ও প্রগতি তথা সার্বিক সমৃদ্ধির শর্তপূরণে আমাদেরকে ভাষার স্বাধীন বিকাশের পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। কৌশল নির্মাণ করতে হবে। সংস্কৃতের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দুর্বোধ্য সংস্কৃত বা সংস্কৃত ভাবধারার শব্দের প্রতিশব্দরূপে প্রয়োজনীয় শুদ্ধিকরণ বা পরিশীলন সাপেক্ষে প্রাত্যহিক জীবনধারার সাথে সংগতিশীল আবহমান বাংলার আটপৌড়ে শব্দকে প্রতিস্থাপন করতে হবে। অর্থ-তাৎপর্য ও প্রাঞ্জলতাকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। পাশাপাশি, আধুনিক বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবশালী ইংরেজি ভাষার প্রচলিত, সাবলীল ও বিকল্পহীন শব্দের ব্যবহারকে গুরুত্ব ও স্বীকৃতি দিতে হবে। একইভাবে হিন্দি, উর্দু, আরবি, ফারসি এমনকি সংস্কৃত শব্দ যা স্বাভাবিক জীবনধারায় মিশে গেছে বা মিশে যেতে সক্ষম, সেগুলোও সমানভাবে আমাদের ভাষার অংশরূপে গণ্য হবে। চেয়ার-টেবিল যেমন আমাদের বাঙলা ভাষায় অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেছে, তেমনি, মার্কেট, বিল্ডিং, ব্যাগ, ফ্রেণ্ড, ওয়েলকাম, শপিং, ব্রাশ, ফোন, ফ্যান, মোটর, ট্রাফিক, নেটওয়ার্ক, ফাইন, প্লিজ, পজিশন, সিনেমা, কমন, রোড, রূম, বেড, প্লেট, মোবাইল, প্রেসক্রিপশন, মেডিসিন, ক্লিনিক, হসপিটাল, নার্স, কেবিন, সিরিঞ্জ, হেল্পার, ড্রাইভার, টেলিভিশন, রেডিও, চ্যানেল, ইলেক্ট্রিক, বাল্ব, ক্যালেন্ডার, শ্যাম্পু,, বেসিন, ওয়াশ, বাথরূম, ডাস্টবিন, কিচেন, শার্ট, পেন্ট, ড্রেস, টাওয়াল, সাইকেল, সানগ্লাস, স্কুল, কলেজ, অফিস, বস, ম্যানাজার, হল, ড্রয়ার, শোকেস, স্মার্ট, ফ্যাশন, এক্সেলেন্ট, হ্যালো, অফ, অন, সুইচ, ওয়েদার, ইলেকশন, ভোট, ক্যানভাস, সাপোর্ট, ইঊনিয়ন, ট্যাক্স, টাউন, অফিসার, টিচার, স্টুডেন্ট, ফার্মেসি, ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, সেন্টার, এক্সরে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, অপারেশন, টিউমার, ক্যান্সার, ইন্টারনেট, লাইব্রেরি, ফ্রিজ, কোয়ালিটি, একশন, রিয়েকশন, পার্লামেন্ট, প্রেসিডেন্ট, মিনিস্টার, চেয়ারম্যান, মেম্বার, ভোটার, পাবলিক, মিটিং, ক্যাপটেন,গাইড, নিউজপেপার, কালার, ইঞ্জিন, মেশিন, vফ্যাক্টরি, ইন্ডাস্ট্রি, টিউবওয়েল, কলোনি, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পার্ক এ রকম অসংখ্য ইংলিশ শব্দ আমাদের চলমান জীবনধারার অংশ হয়ে গেছে বা যাচ্ছে।


ব্যাপক-চর্চিত বা বিকল্পহীন শব্দগুলোকে আমাদের ভাষার অন্তর্ভূক্ত করে নেয়া যেতেই পারে।অনুবাদের ক্ষেত্রে যেসব ইংরেজি শব্দের বাঙলা প্রতিশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না, সেগুলোকে মূলশব্দে অপরিবর্তিত রেখেই অনুবাদ করে নেয়া উচিৎ। এ পদ্ধতি গৃহীত হলে সর্বস্তরে বাঙলার প্রচলনও নিশ্চিত করা যাবে। আমাদের ভাষার সমৃদ্ধির প্রয়োজনেই। এভাবে মুসলিম-প্রধান দেশ হিসেবে এবং মুসলিম শাসনের কারণে অসংখ্য আরবি-ফারসি-তুর্কি শব্দ আমাদের জীবনধারায় মিশে গিয়ে যেমন বাঙলা ভাষার অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেছে, তেমনি ইসলামি পরিভাষার আরো অসংখ্য শব্দ বাঙলা ভাষায় অন্তর্ভূক্ত হতে পারে। এটি মোটেও ভাষার দেউলিয়াত্ব নয়। এসব বিদেশী শব্দের অনুপ্রবেশ অতীতে যেমন বাঙলা ভাষাকে বিনষ্ট করে নি, তেমনি বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতেও করবে না। কারণ, এটিই আসলে ভাষার বিকাশ ও প্রগতির প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় একদিকে যেমন ভাষার ব্যাপ্তি বাড়বে, তেমনি অন্যদিকে অন্যান্য ভাষার সাথে আন্তঃসম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে। যোগাযোগ সহজতর হবে। বিশ্বায়নে সহায়ক হবে। আমাদের মাতৃভাষা বাঙলার বিবর্তন, বিকাশ ও প্রগতিতে উপর্যুক্ত বিষয়গুলো ভেবে দেখা উচিত বলে মনে করছি l

আপনার মতামত লিখুন :