• 73

‘নিউইয়র্কের জীবন রঙিন বটে, তবে অনেক ছুটতে হয়’

‘নিউইয়র্কের জীবন রঙিন বটে, তবে অনেক ছুটতে হয়’

এফএম-৭৮৬ এর নিয়মিত আয়োজন ‘নিউইয়র্ক ডায়েরি’তে অতিথি হয়ে এসেছিলেন নিউইয়র্কে বসবাসরত বিশিষ্ট কবি, কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক তমিজ উদ্দিন লোদী। তিনি কথা বলেছেন তার ব্যক্তিগত জীবন, লেখালেখি, বই পড়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে। আলাপচারিতায় সঙ্গে ছিলেন আরজে মোহনা


প্রবাস জীবন কত বছরের হলো?

সেতো অনেক সময়, দেখতে দেখতে ইতোমধ্যে এক যুগ পার করে ফেললাম। সবমিলিয়ে ১৩ বছর চলছে।


ইউএসএ’তে আসার গল্পটা জানতে চাই।

আসলে তেমন কোনো পুর্ব পরিকল্পনা বা প্রস্তুতি ছিল না। দেশে সরকারি চাকরি করতাম। ছিলাম বাংলাদেশ রেলওয়েতে, সরকারি কোয়ার্টারে থাকতাম। হঠাৎ করেই ডিবি লটারি লেগে গেলো, চলে আসলাম সবার স্বপ্নের দেশ আমেরিকায়।


বাংলাদেশের জীবন আর এখানকার জীবন- কোনটা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যের?

দেশে তো সরকারি চাকরি করতাম- ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত অফিস। একটা রুটিনমাফিক আরামদায়ক জীবন ছিল। সবাই ভাবে, এখানকার জীবন খুব রঙিন, আনন্দের আর সহজ। কিন্তু আমি বলবো, এখানে অনেক ছুটতে হয়, অনেক পরিশ্রম করতে হয়। এখানকার জীবন খুব একটা সহজ নয়। তবে, আমাদের সবাইকে মানিয়ে নিতে হয় তাই আমরা মানিয়ে নিয়েছি। বাংলাদেশকে খুব মিস করি।


লেখালেখির হাতেখড়ি কবে থেকে?

আমার ছোটবেলা গ্রামে কেটেছে। সেখানকার গাছ-পালা, পাখ-পাখালি আর প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য- এই সবকিছু আমাকে মুগ্ধ করতো, আমি বিমোহিত হতাম। যখন ক্লাস টুতে পড়তাম, তখন একবার স্কুলে আবৃত্তি করে একটা কবিতার বই পুরস্কার পেলাম। সেখান থেকে কবিতা পড়ার প্রতি আমার ঝোঁক তৈরি হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর যখন নবম শ্রেণিতে পড়ি তখন স্কুলে একজন কবি এসেছিলেন। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কি স্বরচিত কবিতা বলতে পারবে? আমাদের একজন স্যার ছিলেন আব্দুল মুকিত চৌধুরী, তিনি হঠাৎ করেই আমার নাম বলে দিলেন। স্টেজে গিয়ে কোনোমতে কিছু একটা বলে নেমে এলাম। আমি কবিতা লিখতে পারি, বিষয়টা সেই থেকে পুরো স্কুলে ছড়িয়ে পড়লো।


কবিতা ছাপা হতে লাগলো কখন থেকে?

একবার স্কুলে দেয়াল পত্রিকা করা হবে। মুকিত স্যার আমাকে ডেকে বললেন, তুমি একটা কবিতা দেবে। নিজের মতো করে লিখে কবিতা জমা দিলাম। যখন দেখলাম সেটা স্কুলের দেয়ালে টানানো হয়েছে, সেই থেকে নিজের প্রতি একটা বিশ্বাস চলে আসলো যে, হয়তো আমিও পারবো। লিখে ফেললাম আরো কিছু ছড়া, যদিও তখন ছন্দ জানতাম না। 


পত্রিকায় ছাপা হলো কখন?

ছড়ার পর এক সময় কবিতা লেখা শুরু করলাম। কিছুদিনের মধ্যে মৌলভীবাজার জেলার একটা সাপ্তাহিক পত্রিকায় আমার কবিতা ছাপা হলো। এরপর তো নানা পত্রিকায় কবিতা ছাপা হচ্ছে, আমিও লিখে যাচ্ছি। এক সময় ঢাকার নামকরা পত্রিকা- ইত্তেফাক, যুগান্তর, প্রথম আলোতে কবিতা ছাপা হতে থাকলো। কলকাতার বিখ্যাত পত্রিকা সাপ্তাহিক দেশ, সেখানেও আমার লেখা ছাপা হয়েছে।


এখন পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা কত?

বই প্রকাশের ব্যাপারে আমি বরাবরই অনেক অলস। আশির দশকে অনেক লিখেছি। ১৯৮৫ সালে আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয়। লিখতাম প্রচুর তবে বই প্রকাশের তাগিদটা আমার মধ্যে কেন জানি না কম ছিল। তবুও এখন পর্যন্ত ১০টি কাব্যগ্রন্থ, ৩টি গল্পের বই আর ১টি অনুবাদ গ্রন্থ বেরিয়েছে। 


লেখালেখি ছাড়া আর কোন কাজের সাথে যুক্ত আছেন?

নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক বাংলা’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। এছাড়া সঞ্চালনা করছি টাইম টিভির ‘শিল্প ও সাহিত্য’ অনুষ্ঠান। তবে এই মহামারিতে সবকিছুই থমকে গেছে। আমাদের অনেক বেশি অলস করে দিয়েছে। কোনো কাজই নেই আবার দেখা যাচ্ছে কিছুই করা হচ্ছে না। 


এমন কোনো লেখা আছে যেটা লিখবেন বলে ভাবছেন, কিন্তু লেখা হচ্ছে না...

আসলে প্রত্যেক লেখকই সারাজীবন ধরে চায় আকাঙ্খিত একটা লেখা লিখতে, সেই প্রত্যাশায় প্রতিটি লেখাই খুব ভালোবেসে লিখে যান তারা। কিন্তু একটার পরে আরেকটা লেখার প্রতি তাদের আগ্রহ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। লেখার তৃষ্ণা বোধহয় কোনো লেখকেরই সারা জীবনেও শেষ হয় না।


নতুন প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ কমছে, আপনার কী মন্তব্য?

আসলে যখন থেকে লেখকরা তাদের লেখা দুর্বোধ্য করেছেন তখন থেকেই পাঠকের সাথে বইয়ের দূরত্ব বেড়েছে। এক্ষেত্রে ফরাসী কবির লেখা ‘লা মিজারেবল’-এর উদাহরণ টানতে চাই। কবি হয়েও তিনি লেখক হিসেবে এই বইটি লিখেছিলেন। তাই লেখাকে সহজবোধ্য করতে হবে। আর প্রযুক্তি এসেছে ঠিকই তবুও যাদের বই পড়ার আগ্রাহ আছে তারা কিন্তু ইন্টারনেট বা প্রযুক্তির কল্যাণে নানা রকম উপায় বের করে নিচ্ছে। যে মাধ্যমেই হোক না কেন বই পড়া জরুরি। আর লেখাটা সহজবোধ্য হওয়া বাঞ্চনীয়।

আপনার মতামত লিখুন :