• 162

আমরা স্বাধীন করেছি, আপনারা ঢেলে সাজান

আমরা স্বাধীন করেছি, আপনারা ঢেলে সাজান

বিজয়ের মাস উপলক্ষে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে ‘আমার মুক্তিযুদ্ধ’ নামে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে এফএম-৭৮৬। এই আয়োজনে প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধারা নিজ মুখে যুদ্ধের দুঃসাহসিক গল্প তুলে ধরবেন। এবারের পর্বের অতিথি হিসেবে যুক্ত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ বাবর উদ্দিন। তার সঙ্গে কথা বলেছেন আরজে আরিয়ান


এফএম-৭৮৬: যে বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন, সেই বাংলাদেশ কেমন আছে?

বাবর উদ্দিন: পুরোপুরি ভালো নেই। কিছু কিছু জায়গায় আমরা উন্নতি করেছি বটে কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয়। অবকাঠামোগত উন্নতি হয়েছে কিন্তু বৈষম্য কমেনি। অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটেনি। রাজনৈতিকভাবেও আমাদের মুক্তি আসেনি। যে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছি সেটা আজও ঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি একটা স্থায়ী নির্বাচন পদ্ধতির ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হতে পারেনি। 


মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার বয়স কত ছিলো? পরিবারে কে কে ছিলেন?

বাবর উদ্দিন: এখনকার সময়ের মতো তখন কিন্তু অনেকেরই সঠিক বয়স জানা থাকতো না। আমার বসয় তখন ১৫ কিংবা ১৬ হবে। দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। পরিবারে বাবা-মা, তিন ভাই এবং দুই বোন। যুদ্ধের কয়েক বছর আগে থেকেই বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম হচ্ছে। তাই বয়স অল্প হলেও আমরা বুঝতাম, পাকিস্তানিরা আমাদের শোষণ করছে এবং যুদ্ধ করে তাদের কাছ থেকে মুক্তি পেতে হবে।


আপনার যুদ্ধে যাওয়ার গল্পটা শুনতে চাই।

বাবর উদ্দিন: প্রথমেই ট্রেনিং নিতে ভারত যেতে হবে। আমার পরিচিত কয়েকজন যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। আমিও তাদের সঙ্গে পালালাম। বাড়িতে জানলে হয়তো যুদ্ধে যেতে দেবে না, এই আশঙ্কায় বাবা-মাকে না বলে পালিয়ে গেছি। দেখলাম, আমার মতো অনেকেই পালিয়ে এসেছে।


কীভাবে ভারত গিয়েছিলেন?

বাবর উদ্দিন: সময়টা ১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ দিক। আমরা ছোটখাটো একটা দল হয়ে ভারতের উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম। যখন যাচ্ছিলাম, রাস্তার দুই ধারে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে আমাদেরকে দেখার জন্য। তাদের মুখ থেকে স্পষ্ট প্রার্থনা বেরিয়ে আসছে। তারা বলছিলো- হে আল্লাহ, এদেরকে বাঁচিয়ে রেখো, শেখ সাবকে বাঁচিয়ে রেখো।’ পথচারীদের এমন কথা এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে।


কত টাকা নিয়ে বেরিয়েছিলেন? খাবারের ব্যবস্থা কী ছিলো?

বাবর উদ্দিন: তখন কিন্তু মানুষের হাতে এত টাকা-পয়সা ছিলো না। যতদূর মনে পড়ে, আমি ১৩ টাকা নিয়ে বের হইছিলাম। আর খাবারের ব্যবস্থা বিভিন্নভাবে হয়ে যেতো। আমাদের লিডার যে ছিলো, খাওয়া-থাকা নিয়ে মূলত তিনিই ভাবতেন। আমরা শুধু তাকে ফলো করতাম। তবে যুদ্ধে যাওয়া ছেলেদেরকে তখনকার মানুষ নানাভাবে সাহায্য করতো। কেউ টাকা দিতো কিংবা কেউ খাওয়াতো। এমনকি পরিচয় জানতে পারলে যানবাহনেও ভাড়া নিতে চাইতো না। 


ভারতে কতদিন ছিলেন?

বাবর উদ্দিন: প্রথম দুই-তিন মাস আমাদের কোনো ট্রেনিং হয়নি। অস্ত্রের অভাবসহ প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা ছিলো। এক পর্যায়ে আমরা ক্যাম্প থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম। ভাগ্যক্রমে আমাদের দলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনী ও সেনাবাহিনী প্রধান এমএজি ওসমানীর সঙ্গে। তিনি আমাদের ক্যাম্পে ফিরে যেতে বললেন এবং ৩ দিন পর থেকেই ট্রেনিংয়ের ব্যাবস্থা করবেন বলে আশ্বস্ত করেন। তিনি তার কথা রেখেছিলেন।


কখন যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন এবং কোন সেক্টরে?

বাবর উদ্দিন: আগস্টের দিকে আমরা ফিরে আসি। নির্দেশনা অনুযায়ী, বিভিন্ন ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে একেকজন একেকদিকে চলে যায় যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য। মেজর রফিকের নেতৃত্ব আমি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি ১নং সেক্টরে।


কোন গান কিংবা স্লোগান আপনাকে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছে?

বাবর উদ্দিন: তখন কমন কয়েকটি দেশাত্ববোধক গান আমাদের কণ্ঠে লেগেই থাকতো। তবে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা জোগাতো জাতীয় সঙ্গীতের দুটি লাইন- ‘তোমার এই খেলাঘরে শিশুকাল কাটিল রে, তোমারি ধুলামাটি অঙ্গে মাখি ধন্য জীবন মানি। তখন অবশ্য এটা আমাদের জাতীয় সঙ্গীত ছিলো না। এছাড়া জয় বাংলা ছিলো আমাদের জাতীয় স্লোগান। সমস্বরে এটা উচ্চারণ করলেই গায়ে কাটা দিয়ে উঠতো। নিজের ভেতরে একটা শক্তি পেতাম। আরেকটা স্লোগান ছিলো- তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা।


বিজয় উদযাপন করেছিলেন কীভাবে? তখনকার অনুভূতি কেমন ছিলো?

বাবর উদ্দিন: ভাষারও কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে কেমন অনুভ‚তি হয়েছিলো সেটা ভাষায় প্রকাশ করা দুরূহ। মুক্তিযোদ্ধারা অনেকেই খুশিতে কাঁদছিলো। আমরা অবশ্য তারও এক সপ্তাহ আগেই জয়ের সুঘ্রাণ পেতে শুরু করেছিলাম। অনেক জায়গায় পাক বাহিনীকে পাকড়াও করা হয়েছিলো। এরপর যখন জয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসলো তখন বাজি ফুটিয়ে, স্লোগানে স্লোগানে, বিজয় মিছিলের মাধ্যমে আমরা উদযাপন করেছিলাম সেই মহেন্দ্রক্ষণ। 


বর্তমান প্রজন্মের জন্য কী বার্তা দিতে চান?

বাবর উদ্দিন: যুদ্ধ জয়লাভের পর তিনটি ছোট ছোট বাক্যে শপথ গ্রহণ করেছিলাম আমরা। সেগুলো হলো- মিথ্যা বলবো না, চুরি করবো না, হারাম খাবো না। সেই শপথ আজ আরো বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। আমি বর্তমান প্রজন্মকে অনুরোধ করবো, আপনারাও নিজ নিজ জায়গা থেকে এই তিনটি শপথ গ্রহণ করুন। সুন্দর একটা বাংলাদেশ গড়ার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। আমরা দেশকে স্বাধীন করেছি, এবার আপনাদের পালা এটাকে ঢেলে সাজানোর।

আপনার মতামত লিখুন :